গর্ভবতী অবস্থায় যে সকল পুষ্টি প্রয়োজন

গর্ভবতী অবস্থায় যে সকল পুষ্টি প্রয়োজন

বাবুর আকিকা

গর্ভবতী অবস্থায় স্বাস্থ্যকর খাবার আরও বেশি করে খেতে হয়। কারণ, তখন শিশুর পুষ্টি পূরণ করতে হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টিসম্পন্ন খাবার শিশুর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, আপনি দুইজনের খাবার খাচ্ছেন, এটা চিন্তা করে অনেক বেশি খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আপনি সাধারণ সময়ের তুলনায় এ সময় অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ ক্যালোরি গ্রহণ করেন। অনেক নারীরাই প্রথম তিনমাস অনেক বেশি ক্ষিদের অনুভব করেন। সকালের অসুস্থতা ও বমি বমি ভাবের জন্য খাবারের চাহিদা কমে যায়। তবে আসলে যা মনে রাখা উচিত, তা হল-

      ১. স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বলতে, আপনাকে অবশ্যই তাজা ফল ও শাকসবজি খেতে হবে। প্রয়োজনমত পর্যাপ্ত পরিমাণে এসকল খাবার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। এছাড়াও, একটি নিয়মিত ভিত্তিতে চর্বিহীন মাংস, মাছ ও হাঁস-মুরগি অবশ্যই থাকা উচিত।

      ২. আপনার যদি জাঙ্ক ফুড খাবার ইচ্ছে হয়, তাহলে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন। জাঙ্ক ফুডে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি থাকে, তাই এগুলো না খাওয়া সবচেয়ে ভাল। তবে যদি খেতেই হয়, তাহলে অল্প পরিমাণে খেতে পারেন। নিয়মিতভাবে কখনোই জাঙ্ক ফুড খাবেন না। এতে স্বাস্থ্যের অবনতি হবার আশংকা রয়েছে।

      ৩. আপনার রান্নাঘরে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখার ব্যবস্থা করুন। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। ঘরে সবসময় সিরিয়াল ও গোটা শস্য অবশ্যই রাখবেন।

      ৪. আপনার ডাক্তারের নিকট থেকে পরামর্শ নিয়ে একটি ভিটামিন ঔষধ সেবনের ব্যবস্থা করুন। যাতে আপনার প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের মাত্রা ঠিক থাকে। এভাবে, আপনি ও আপনার শিশু উভয়ের অত্যাবশ্যক পুষ্টির অভাব পূর্ণ হবে।

      ৫. ক্যালসিয়াম এবং আয়রন গর্ভবতী মহিলাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খাবার। তাই ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার আপনার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় অবশ্যই রাখুন। সব ধরনের দুগ্ধজাত খাবারে ক্যালসিয়াম অন্তর্ভুক্ত। লতাপাতা, চর্বিহীন মাংস ও মটরশুঁটিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে।

      ৬. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি হল ভিটামিন সি। কমলালেবু , পেঁপে , ব্রোকলি , টমেটো , স্ট্রবেরি এবং ব্রাসেলস স্প্রাউট ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি বিদ্যামান। এসব ফলমূল খাবার চেষ্টা করুন।

      ৭. গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ফলিক এসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। গাঢ় সবুজ শাক সবজি ও শিমে ফলিক এসিড রয়েছে।

      ৮. সপ্তাহে অন্তত চারবার ভিটামিন এ আপনার খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। গাজর , লতাপাতা , এপ্রিকট এবং মিষ্টি আলু ইত্যাদি খাবার সমূহ এই তালিকাভুক্ত।


নিজের ও গর্ভের সন্তানের ভালভাবে যত্ন নেয়ার জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে, খাবারের একটি নির্দিষ্ট তালিকা করে নিলে সবচেয়ে ভাল সুফল পাওয়া যায়। সূত্র: টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া। (bd24live dot com)

গর্ভকালীন বিপজ্জনক উপসর্গ

গর্ভকালীন বিপজ্জনক উপসর্গ

নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য একজন গর্ভবতীকে জীবনের সংকটময় মুহূর্তগুলোর কথা অবশ্যই জানা দরকার। এর ফলে মা ও অনাগত শিশু অনেক অনাকাক্সিক্ষত সমস্যার হাত থেকে বেঁচে যায়। মাতৃত্বকে বরণ করতে গিয়ে আমাদের সমাজে এখনও অনেক মায়ের জীবনে ট্র্যাজেডি নেমে আসে। মাতৃমৃত্যুর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কিছু বিপদ সংকেত হবু মায়েদের জানানো ও তার প্রতিকারের উপায় নিয়ে এ লেখা-

অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, সেন্ট্রাল হাসপাতাল,ঢাকা

গর্ভাবস্থায় পা ফুলে যাওয়া, রক্তক্ষরণ হওয়া, প্রসব ব্যথা ১২ ঘণ্টার বেশি হওয়া, সন্তান প্রসবের পর জ্বর ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নিঃসরণ গর্ভাবস্থায় বিপদ সংকেত বা রেড ফ্ল্যাগ হিসেবে পরিচিত।

গর্ভাবস্থায় পা ফুলে যাওয়া, ঘন ঘন মাথা ধরা ও খিচুনি ওঠা

কারণ একলাম্পসিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একলাম্পসিয়া এক ধরনের মারাত্মক খিচুনি রোগ যা গর্ভকালীন ও সন্তান হওয়ার পরপরই হয়ে থাকে। একলাম্পসিয়া রোগটি সাধারণত যারা প্রথমবারের মতো গর্ভবতী হন তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় পাঁচ মাস পর থেকে শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে এবং হাতে-পায়ে পানি এসে যায়। এরপর ঘন ঘন মাথাব্যথা হতে থাকে। রোগীর ব¬াডপ্রেসার বেড়ে যেতে থাকে এবং প্রস্রাবে এলবুমিন বা প্রোটিন যেতে থাকে। এগুলো সবই প্রি-একলাম্পসিয়া বা একলাম্পসিয়ার হওয়ার পূর্বলক্ষণ। এরপর থেকে যদি পরিমিত বিশ্রাম ও বলাডপ্রেসার কমানোর ওষুধ না খাওয়া হয় তাহলে অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। কখনও কখনও রোগী চোখে ঝাপসা দেখে। পেটের ওপরের দিকে বেশ ব্যথা হয়। সেই সঙ্গে মাথাব্যথা তো আছেই। এ লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে ‘একলাম্পসিয়া আসন্ন’। এমনি অবস্থাতে হঠাৎ করেই রোগীর খিচুনি উঠে যায় এবং গর্ভবতী মা ও শিশুটির জীবন মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়। এ সময়ে যদি সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা না করা হয় তাহলে মৃত্যু প্রায় অবসম্ভাবী হয়ে পড়ে। সে জন্য যখনই বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দেয় তখন দেরি না করে অবশ্যই চিকিতসকের পরামর্শ নেবেন।

গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ

গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ হওয়া মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রথম ৫ মাসের মধ্যে রক্তক্ষরণ হওয়ার অর্থ হল গর্ভস্থ ভ্রণটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে বা গর্ভপাত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল হয়ে উঠেছে। রক্তক্ষরণ হওয়ার পরপরই যদি ব্যথা শুরু হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে যে ভ্রণটি আর গর্ভে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবে না। জরায়ু থেকে বেরিয়ে যাবে। বিপত্তি ঘটে ভ্রণের সামান্য অংশ বের হয়ে যাওয়ার পর, বাকি অংশটুকু থেকে যাওয়ায়। তখন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং চিকিতসা না নিলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময়ে রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন হয়।  সেই সঙ্গে ভ্রণের বাকি অংশগুলো বের করে ফেলার জন্য ডিঅ্যান্ডসি করতে হয়। কাজেই এ অবস্থায় দ্রুত চিকিতসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় পাঁচ মাসের পরও যদি রক্তক্ষরণ হয় এখানেও সন্তান নষ্ট হয়ে গর্ভপাত হতে পারে অথবা সময়ের আগেই সন্তানের জন্ম হতে পারে। এ বাচ্চা বাঁচানো খুবই কঠিন এবং মায়ের জীবনেও ঝুঁকি নেমে আসতে পারে। গর্ভাবস্থায় ‘গর্ভফুলের ভুল অবস্থানের’ কারণেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। গর্ভফুল যদি জরায়ুর ওপরের দিকে না থেকে জরায়ুর নিচের দিকে অবস্থান করে তখন সমস্যা আরও জটিল হয়ে যায়। জরায়ুর নিচের দিকে যদি গর্ভফুল থাকে তাহলে প্রসব ব্যথা উঠলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এ রক্তক্ষরণ বন্ধ করার উপায় হল দ্রুত সিজারিয়ান অপারেশন করে শিশু ও গর্ভফুলটিকে বের করা। এ ধরনের অবস্থাতে রোগীকে রক্ত না দিলে বাঁচানো কঠিন। কাজেই গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণকে সব সময়ই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর রক্তক্ষরণ কিছু হওয়া স্বাভাবিক। যদি দেখা যায় সন্তান প্রসবে বেশ রক্তক্ষরণ হচ্ছে, মোটামুটি এক গ্লাসের (একপোয়া) চেয়ে বেশি যাচ্ছে তখনই সতর্ক হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তলপেটে মালিশ করতে হবে এবং চিকিতসকের পরামর্শ ইনজেকশন অক্সিটোসিন মাংসপেশিতে দিতে হবে। মিসোপ্রোসটল বড়ি তিনটি মুখে খাওয়াতে হবে এবং তলপেটে মালিশ করতে করতে হাসপাতালে দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবারের দু-তিনজন সদস্য যারা রক্ত দিতে সক্ষম তাদেরও পাঠাতে হবে। কারণ রোগীর জীবন বাঁচাতে পারিবারিক রক্ত বিশেষ সাহায্য করবে। মনে রাখবেন পারিবারিক রক্ত নিরাপদ। বাইরের কেনা রক্ত থেকে রোগজীবাণু সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

বাধাগ্রস্ত প্রসব

প্রসব ব্যথা ১২ ঘণ্টার বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে বুঝতে হবে সন্তান প্রসবে কোনো জটিলতা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ সময় প্রসব ব্যথা ওঠার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়। যদি এ সময়সীমার মধ্যে না হয় তখন চিকিতসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রসব ব্যথা এভাবে বিলম্বিত হলে সন্তানের মাথার ওপর খুব চাপ পড়ে গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভেতর যে পানির থলি আছে যেখানে বাচ্চা ভেসে বেড়ায় সেই থলিটি ভেঙে দিয়ে যদি সব পানি বের হয়ে যায় তখন জরায়ুটা গিয়ে সরাসরি বাচ্চার শরীর ও মাথার ওপর চাপ দিতে থাকে। এভাবে চলতে চলতে বাচ্চার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বাচ্চা পেটের ভেতরেই মারা যেতে পারে। এদিকে বারবার প্রসব ব্যথার যন্ত্রণায় মা অত্যন্ত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন। কখনও কখনও জরায়ু ফেটে যায় এবং মা মারা যায়। জরায়ু যদি নাও ফাটে সে ধরনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা দেখা যায় যা সারাজীবনের জন্য মাকে রুগ্ণ্ অথবা পঙ্গু করে দেয়। তাই প্রসব ব্যথা ১২ ঘণ্টার বেশি হলে গর্ভবতীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

জ্বর ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব

সন্তান প্রসবের পর মায়ের শরীর স্বাভাবিকভাবেই একটু দুর্বল থাকে, যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে প্রসব করানো না হয় বা পরিচ্ছন্নতার নিয়ম-কানুন না মানা হয় তাহলে জরায়ুর ভেতর ইনফেকশন বা প্রদাহ হয়। এছাড়াও প্রসব ব্যথা ১২ ঘণ্টার বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে অথবা পানির থলে আগেই ভেঙে গেলে ইনফেকশন হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এ ইনফেকশন সামান্য থেকে আরম্ভ করে অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। মারাত্মক হলেই জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যে কারণে সন্তান প্রসবের পর জ্বর যদি পরপর দু’দিন থাকে তাহলে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। অনেকেই এ জ্বরকে অন্য সময়ের সাধারণ জ্বর মনে করে থাকেন। সন্তান জন্মর তিন দিনের মধ্যে বুকে দুধ, নামে সে জন্য সামান্য জ্বর হয়, আবার বাচ্চা দুধ টানলেই জ্বর ভালো হয়ে যায়। জ্বরের সঙ্গে তলপেটে ব্যথা অনুভব বা চাপ দিলে ব্যথা হয় এবং সেই সঙ্গে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যদি যায় তাহলে বুঝবেন যে ইনফেকশন মারাত্মক রূপ নিয়েছে এবং সেপটিক হয়ে গেছে। এ সময় হাসপাতালে যাবেন অথবা বিশেষজ্ঞ চিকিতসকের পরামর্শ নেবেন।

সৌজন্যে : দৈনিক যুগান্তর